শোবার দিক থেকে বাড়ির নকশা সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধির উপায়
ভারতীয় সমাজে বাড়ি শুধু চারটে দেয়াল আর একটি ছাদ নয়। বাড়ি মানে নিরাপত্তা, শান্তি, পরিবার আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তাই নতুন বাড়ি বানানোর আগে বা পুরনো বাড়িতে থাকার সময় অনেকেই বাস্তু শাস্ত্রের কথা ভাবেন। কেউ বিশ্বাস করেন গভীরভাবে, কেউ আবার পুরোটা না মানলেও কিছু নিয়ম মেনে চলতে চান। কিন্তু বাস্তব কথা হল, বাস্তু শাস্ত্রের অনেক নিয়মই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়।
এই লেখায় বাস্তু শাস্ত্রকে কোনো অলৌকিক বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হবে না। বরং ভারতীয় বাস্তবতা, গ্রাম শহরের পরিচিত উদাহরণ আর সহজ ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করা হবে। শোবার দিক থেকে শুরু করে বাড়ির নকশা, রান্নাঘর, পুজোর ঘর, আলো বাতাস সব কিছু নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেওয়াই এই গাইডের উদ্দেশ্য।
বাস্তু শাস্ত্র কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাস্তু শাস্ত্র আসলে প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্য ও জীবনবিজ্ঞানের একটি শাখা। এর মূল ভাবনা হল প্রকৃতির শক্তির সঙ্গে মানুষের বসবাসকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। সূর্যের আলো, বাতাসের গতি, জমির দিকনির্দেশ সব কিছু মিলিয়ে একটি ভারসাম্য তৈরি করার চেষ্টা।
আগেকার দিনে মানুষ বিদ্যুৎ, এয়ার কন্ডিশনার ছাড়াই এমন বাড়ি বানাতেন, যেখানে আলো বাতাস স্বাভাবিকভাবে ঢুকত। গরমে ঠান্ডা থাকত, বর্ষায় জল জমত না। বাস্তু শাস্ত্রের অনেক নিয়ম সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই এসেছে।
আজকের দিনে সব নিয়ম শতভাগ মানা সম্ভব নয়। তবে কিছু মৌলিক বিষয় মেনে চললে বাড়ির পরিবেশ অনেকটাই আরামদায়ক ও শান্তিপূর্ণ হয়।
বাড়ির দিকনির্দেশের গুরুত্ব
বাস্তু শাস্ত্রে দিকনির্দেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ এই চার দিকের সঙ্গে সূর্য, বাতাস আর শক্তির প্রবাহ জড়িত বলে মনে করা হয়।
ভারতের বেশিরভাগ অঞ্চলে দেখা যায়, পূর্বমুখী বাড়িতে সকালের সূর্যের আলো ভালোভাবে ঢোকে। এতে ঘর স্বাস্থ্যকর থাকে। উত্তর দিককে ধন ও সুযোগের দিক হিসেবে ধরা হয়। তাই অনেক সময় উত্তর দিকে খোলা জায়গা বা জানালা রাখতে বলা হয়।
দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক তুলনামূলকভাবে গরম হয়। তাই এই দিকগুলো ভারী কাঠামো বা কম খোলা রাখার কথা বলা হয়। গ্রামাঞ্চলের পুরনো বাড়িগুলো লক্ষ্য করলে এই ধরণের নকশা আজও দেখা যায়।
শোবার দিক কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
মানুষ জীবনের এক তৃতীয়াংশ সময় ঘুমিয়ে কাটায়। তাই ঘুমের দিক বাস্তু শাস্ত্রে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ভুল দিক মাথা করে শোওয়ার ফলে ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা, ক্লান্তি দেখা দিতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়।
সাধারণভাবে দক্ষিণ দিকে মাথা করে শোওয়াকে ভালো বলা হয়। এতে শরীর ও মনের ভারসাম্য বজায় থাকে বলে ধারণা। পূর্ব দিকে মাথা করে শোওয়াও শিক্ষার্থী ও চিন্তাশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জন্য ভালো বলা হয়।
উত্তর দিকে মাথা করে শোওয়া অনেক বাস্তু বিশেষজ্ঞ নিরুৎসাহিত করেন। বলা হয় এতে ঘুমের গভীরতা কমে, মানসিক অস্থিরতা বাড়ে। যদিও আধুনিক জীবনে অনেকেই এই নিয়ম মানতে পারেন না, তবুও সম্ভব হলে দিক পরিবর্তন করে দেখা যেতে পারে।
শোবার ঘরের অবস্থান
শুধু শোবার দিক নয়, শোবার ঘরের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির দক্ষিণ পশ্চিম অংশকে প্রধান শোবার ঘরের জন্য ভালো বলা হয়। কারণ এই অংশ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও ভারী শক্তির প্রতীক।
বাড়ির উত্তর পূর্ব অংশকে হালকা ও পবিত্র ধরা হয়। তাই এই অংশে শোবার ঘর না রেখে পুজোর ঘর বা খোলা জায়গা রাখা ভালো।
শিশুদের শোবার ঘর সাধারণত পশ্চিম বা উত্তর দিকে হলে ভালো বলা হয়। এতে পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ে বলে ধারণা।
রান্নাঘর এবং আগুনের দিক
রান্নাঘর বাস্তু শাস্ত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি আগুনের সঙ্গে সম্পর্কিত। আগুন ও জলের সঠিক ভারসাম্য না হলে সমস্যা হতে পারে বলে মনে করা হয়।
দক্ষিণ পূর্ব দিক রান্নাঘরের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বলে ধরা হয়। এই দিককে আগুনের দিক বলা হয়। রান্না করার সময় মুখ পূর্ব বা উত্তর দিকে রাখা ভালো।
গ্রাম বাংলার পুরনো বাড়িগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, রান্নাঘর প্রায়ই দক্ষিণ পূর্ব কোণে থাকত। এটি কাকতালীয় নয়, বরং প্রজন্মের অভিজ্ঞতার ফল।
রান্নাঘরের পাশে বাথরুম বা টয়লেট রাখা বাস্তু মতে ভালো নয়। আগুন ও নোংরা জলের সংঘর্ষ এড়াতে বলা হয়।
পুজোর ঘর বা ধ্যানের জায়গা
বাড়ির উত্তর পূর্ব কোণকে বাস্তু শাস্ত্রে সবচেয়ে পবিত্র অংশ হিসেবে ধরা হয়। একে ঈশান কোণও বলা হয়। এই অংশে পুজোর ঘর বা ধ্যানের জায়গা রাখা ভালো।
এই জায়গা যতটা সম্ভব পরিষ্কার, হালকা ও খোলা রাখা উচিত। এখানে ভারী আসবাব বা স্টোররুম রাখা বাস্তু মতে শুভ নয়।
অনেক ছোট ফ্ল্যাটে আলাদা পুজোর ঘর সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে উত্তর পূর্ব দিকের দেয়ালে একটি ছোট পুজোর তাক রাখলেও ভালো ফল পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস।
বাথরুম এবং টয়লেটের অবস্থান
বাস্তু শাস্ত্রে বাথরুম ও টয়লেটকে নেতিবাচক শক্তির উৎস বলা হয়। তাই এগুলোর অবস্থান খুব গুরুত্বপূর্ণ।
পশ্চিম বা উত্তর পশ্চিম দিক বাথরুমের জন্য তুলনামূলকভাবে ভালো। উত্তর পূর্ব বা কেন্দ্রস্থলে টয়লেট থাকলে বাস্তু দোষের কথা বলা হয়।
আজকের শহুরে ফ্ল্যাটে এই নিয়ম মানা অনেক সময় সম্ভব হয় না। তবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিয়মিত আলো বাতাস ঢোকানো এই সমস্যার প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।
বাড়ির প্রধান দরজা
বাড়ির দরজাকে শক্তির প্রবেশপথ বলা হয়। কোন দিক থেকে দরজা খুলছে, সেটার উপর অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পূর্ব বা উত্তরমুখী প্রধান দরজাকে সাধারণত শুভ বলা হয়। দরজার সামনে যেন আবর্জনা, অন্ধকার বা ভাঙা জিনিস না থাকে।
গ্রাম বা মফস্বলের বাড়িতে দেখা যায়, দরজার সামনে তুলসী গাছ বা খোলা উঠোন থাকে। এতে আলো বাতাস সহজে ঢোকে, পরিবেশও সুন্দর থাকে।
বাড়ির আলো বাতাস ও খোলা জায়গা
বাস্তু শাস্ত্র শুধু দিকনির্দেশ নয়, আলো বাতাসের উপরও জোর দেয়। যে বাড়িতে পর্যাপ্ত আলো ও হাওয়া ঢোকে, সেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভালো থাকে।
বাড়ির কেন্দ্রস্থল যতটা সম্ভব খোলা রাখা ভালো। একে ব্রহ্মস্থান বলা হয়। খুব ভারী জিনিস বা দেওয়াল দিয়ে এই অংশ আটকে দিলে ঘরের ভারসাম্য নষ্ট হয় বলে মনে করা হয়।
আজকের ছোট ফ্ল্যাটে এটা পুরোপুরি সম্ভব না হলেও অন্তত ঘরের মাঝখানে আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা উচিত।
বাস্তু দোষ মানেই কি ভয়
অনেকেই বাস্তু দোষ শব্দটা শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বাস্তবে সব বাস্তু দোষ জীবনে বড় ক্ষতি করে এমন নয়।
অনেক বাস্তু বিশেষজ্ঞও বলেন, বাস্তু শাস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য হল আরামদায়ক ও স্বাস্থ্যকর জীবন। যদি কোনো নিয়ম মানা সম্ভব না হয়, তবে তার বিকল্প সমাধান খোঁজা যায়।
অন্ধ বিশ্বাসে না গিয়ে যুক্তি ও বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে বাস্তু দেখা উচিত।
বাস্তু শাস্ত্র আর আধুনিক জীবন
আজকের জীবনে আমরা ফ্ল্যাটে থাকি, ভাড়াবাড়িতে থাকি। সব নিয়ম মানা সম্ভব নয়। তাই বাস্তু শাস্ত্রকে কঠোর নিয়ম হিসেবে না দেখে দিশা নির্দেশনা হিসেবে দেখা ভালো।
ঘর পরিষ্কার রাখা, আলো বাতাস ঢোকানো, ঘুম ও রান্নার সময় দিক নিয়ে সচেতন থাকা এগুলো ছোট ছোট পরিবর্তনই অনেক সময় বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।
শেষ কথা
বাস্তু শাস্ত্র কোনো জাদু নয়, আবার পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয়ও নয়। এটা আসলে প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের একটি পুরনো জ্ঞানভাণ্ডার।
আপনি যদি বিশ্বাস করেন, নিয়মগুলো ধীরে ধীরে নিজের জীবনে মানিয়ে নিন। আর যদি না করেন, তবুও এই লেখার কিছু বাস্তব দিক আপনার বাড়িকে আরও সুন্দর ও আরামদায়ক করতে সাহায্য করবে।
শান্তি, সুখ আর সমৃদ্ধি শুধু দিকনির্দেশে নয়, মানুষের চিন্তাভাবনাতেও লুকিয়ে থাকে। বাস্তু শাস্ত্র সেই চিন্তাকে একটু গোছাতে সাহায্য করে, এর বেশি কিছু নয়।
Know more news: Lucky Zodiac Signs: কর্মফলদাতা শনিদেবের কৃপা শীঘ্রই বর্ষিত হতে চলেছে! আসন্ন দিনগুলিতে কারা লাভবান হবে?
1 thought on “বাস্তু শাস্ত্র সম্পূর্ণ গাইড শোবার দিক বাড়ির নকশা সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধির উপায়”